পারিবারিক জীবন হযরত আবু বকর রাঃ

0
1

বিয়ে ও সন্তান সন্ততি

আবুবকর মােট চারটি বিয়ে করেছিলেন। দু’টি মক্কায়, দু’টি মদীনায়। মক্কায় অবস্থানকালে তিনি প্রথম বিয়ে করেন কুতাইলাকে। তারপর উম্মে রােমানকে। কুতাইলার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল্লাহ্ ও আসমা। উম্মে রােমানের গর্ভে জন্ম হয় আবদুর রহমান ও আয়েশার । উম্মে রােমান মদীনায় হিজরত করেন এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। রসুলুল্লাহ্ তাঁর জানায়ায় শরীক হয়েছিলেন। হযরত আবুবকর তৃতীয় ও চতুর্থ বিয়ে করেন মদীনায় আসার পর। তৃতীয় স্ত্রীর নাম আসমা। ইনি আমিসের কন্যা এবং হযরত আলীর ভাই জাফরের বিধবা স্ত্রী। মুতা যুদ্ধে জাফর শহীদ হলে আবুবকর আসমাকে বিয়ে করেন। আসমার গর্ভে আবুবকরের তৃতীয় পুত্র মােহাম্মদ জন্মগ্রহণ করেন। চতুর্থ স্ত্রী হচ্ছে বিবি হাবিবা। কুলসুমের জন্ম হয়।

থাকার ঘর

হযরত আবুবকর মদীনায় এসে শহরের উপকণ্ঠে সুন্নাহ নামক গ্রামে তাঁর স্ত্রী হাবিবার সাথে বাস করতে থাকেন। খলিফা পদ লাভ করার পরও সাতমাস পর তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। প্রত্যেক দিন ভাের বেলায় তিনি পদব্রজে অথবা অশ্বপৃষ্ঠে মসজিদুন-নববীতে এসে রাজকার্য পরিচালনা করতেন এবং এশার নামাজ সমাপনান্তে ঘরে ফিরতেন। পরে যখন দেখলেন যে ওরকমভাবে আসা-

যাওয়ায় অনেক সময় অনর্থক নষ্ট হয়ে যায়, তখন তিনি সপরিবারে মদীনায় এসেই বাস করতে লাগলেন।

স্নেহ –-মমতা 

রসুলুল্লাহ্র মতাে আবুবকরও ছিলন অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ ও কোমলহৃদয়। প্রতিবেশী বালক-বালিকাদেরকে তিনি সব সময় স্নেহ করতেন। আবুবকরকে দেখলেই তারা ছুটে এসে নিজেদের ছােটখাট নালিশ ও সুখ-দুঃখের কথা তাঁকে বলত। আবুবকরকে পরম ধৈর্যের সাথে তাদের কথা শুনতেন এবং কাউকে আদর করে, কাউও বা চুম্বন দিয়ে সান্ত্বনা দিতেন। অনেক সময় প্রতিবেশীদের ছাগল-ভেড়া তিনি চড়িয়ে আনতেন। কোন কোন সময় তাদের ছাগ-দুগ্ধ তিনি নিজে দোহন করে দিতেন।  আপদে-বিপদে সব সময়ই তিনি তাদেরকে যথাসাধ্য সাহায্য করতেন। খলিফা হবার পর রাজকাজের তাগিদে তিনি এসব দিকে বেশি মনােযােগ দিতে পারেন নি। সে সময় একদিন পথ দিয়ে যাবার সময় একটি বালিকা হযরত আবুবকরকে শুনিয়ে শুনিয়ে অপুর বালিকাদেরকে বলতে লাগল, “উনি এখন

খলিফা হয়েছেন, তাই আর আমাদের বকরী দুহায়ে দেন না।” আবুবকর একথা শুনে বললেন, “আমি এখনও তােমাদের বকরী চরিয়ে দিতে বা বকরী দুহায়ে দিতে তৈরি আছি। অবসর পেলেই তােমাদের এসব কাজ করে দিব।” প্রকৃতপক্ষে করতেনও তাই। প্রায়ই তিনি নিজের বকরী ও প্রতিবেশীদের বকরী একসাথে করে চরিয়ে আনতেন এবং দুঃস্থ ও পীড়িতদের সেবা করতেন। রাত্রিকালে প্রায়ই তিনি নগর ভ্রমণে বের হতেন এবং আর্ত-পীড়িতদের সাহায্য করতেন।

আড়ম্বরহীনতা

আবুবকরের জীবন ছিল অত্যন্ত আড়ম্বরহীন সহজ ও সরল । খুব সাধারণভাবে তিনি জীবনযাপন করতেন। ব্যবসা দিয়ে প্রভূত ধনসঞ্চয় করলেও তিনি কোনদিন বিলাসিতার প্রশ্রয় দেন নি। সব অর্থই তিনি দীনদরিদ্রের সাহায্যে ব্যয় করেছেন । খলিফার পদমর্যাদা তার জীবনে কোনই পরিবর্তন আনে নি। আগের মতাে তিনি ছাগল চরিয়েছেন এবং কাধে করে বাজারে কাপড় বিক্রি করতে গেছেন। খলিফা পদ লাভের পরদিনই হযরত আবুবকর এই এক বাণ্ডিল কাপড় নিয়ে বাজারে   বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন, পথিমধ্যে হযরত ওমরের সাথে তাঁর সাক্ষাত হলাে। ওমর জিজ্ঞেস করলেন, “এখন কেন কাপড় বিক্রি করবেন?” আবুবকর বললেন, “জীবন ধারণের উপায় কি? হাওয়া খেয়ে তাে বাঁচতে পারি না।” আর একদিন তাঁর স্ত্রী হালুয়া তৈরি করার জন্য খলিফার কাছে কিছু ময়দা চাইলেন, খলিফা বললেন, অতিরিক্ত চিনি দিতে তিনি অক্ষম। বুদ্ধিমতী স্ত্রী তখন দৈনিক খরচ থেকে কিছু কিছু চিনি বাঁচিয়ে কিছুদিন পর খলিফার কাছে কিছু ময়দা চাইলেন । খলিফা তখন ময়দা দেয়া দূরে থাক জিজ্ঞেস করলেন, “চিনি কোথায় পেলে?” স্ত্রী উত্তর দিলেন, “প্রতিদিন একটু একটু করে বাঁচিয়ে আমি এতখানি সঞ্চয় করেছি।” এ বলে তিনি সঞ্চিত চিনির পরিমাণ খলিফাকে দেখালেন। খলিফার

তখন ভাবান্তর উপস্থিত হলাে, তিনি বললেন, তা হলে তাে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে আমরা বায়তুলমাল থেকে প্রয়ােজনের অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করছি। এ বলে তিনি সেই চিনি বায়তুল ভাণ্ডারে ফিরিয়ে দিয়ে এলেন, এবং সে অনুসারে চিনির মাসিক বরাদ্দ কমিয়ে দিলেন।

বেতন

হযরত আবুবকরের বার্ষিক বেতন ছিল মাত্র ২,৫০০ দিরহাম, অর্থাৎ মাসিক প্রায় ১০০ টাকা। তার আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা এবং বদান্যতার কথা চিন্তা করলে এই বেতন খুব নগণ্য বলে মনে হবে। খেলাফতের প্রথম ছয় মাস তিনি রাজকোষ থেকে কোন অর্থই গ্রহণ করেন নি, কারণ রাজকোষ তখন প্রায় শূন্যই ছিল। বায়তুলমাল থেকে তাঁকে মাত্র দু’টি পােশাক দেয়া হতাে; একটি শীতকালে ব্যবহারের জন্য আর একটি গরমকালে ব্যবহারের জন্য। রাজকাজ পরিচালনার জন্য স্বতন্ত্র কোন অফিস ঘরও তার ছিল না। মসজিদুল নববীতে বসেই তিনি সারাদিন রাজকাজ সম্পন্ন করতেন। এরকমই ছিলেন ইসলামের প্রথম রাষ্ট্রপতি। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here