বেহালা বাদকের সদগতি | হযরত বড় পীর সাহেবের ঘটনা

0
195
বেহালা বাদকের সদগতি | হযরত বড় পীর সাহেবের ঘটনা
বেহালা বাদকের সদগতি | হযরত বড় পীর সাহেবের ঘটনা

বেহালা বাদকের সদগতি – একদিন হযরত বড় পীর সাহেব তাঁহার ওয়াজের মজলিসে দাঁড়াইয়া ওয়াজ
করিতে করিতে হঠাৎ থামিয়া গেলেন এবং উপস্থিত শ্রোতাদের বলিলেন- তােমাদের মধ্যে কেহ আমাকে এখনই একশত দীনার ধার দিতে পার কি? তখন অনেকেই তাঁহাকে একশত দীনার ধার দেওয়ার জন্য অগ্রসর হইল । তিনি একজনের নিকট হইতে একশত দীনার গ্রহণ করিয়া আবু রেজা নামে তাহার জনৈক খাদেমকে বলিলে— এই দীনারগুলি লইয়া এখনই গুনিজীয়া কবরস্তানে চলিয়া যাও। সেখানে যাইয়া দেখিতে পাইবে যে, একজন বৃদ্ধলােক বেহালা বাজাইয়া গান গাইতেছে। তুমি তাহাকে দীনারগুলি প্রদান করিবে।

বেহালা বাদকের সদগতি

আবু রেজা দীনারগুলি লইয়া উক্ত কবরস্তানে যাইয়া সত্যই একজন বৃদ্ধকে বেহালা বাজাইয়া গান গাইতে দেখিল। সে হযরত বড় পীর সাহেবের নির্দেশ মত দীনারগুলি তাহাকে প্রদান করিল। হঠাৎ এতগুলি দীনার হাতে পাইয়া। বৃদ্ধ আনন্দে আত্মহারা হইয়া গেল। সে জিজ্ঞাসা করিল, ভাই। এই দীনারগুলি কে পাঠাইয়াছেন?
আবু রেজা উত্তর করিল, হযরত বড় পীর সাহেব ইহা তােমাকে দেওয়ার জন্য আমাকে আদেশ করিয়াছেন।

বৃদ্ধ আবু রেজাকে বলিল—– চল আমি তােমার সহিত যাইয়া হযরত বড় পীর সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিব। আবু রেজা তাহাকে সঙ্গে লইয়া হ্যরত বড় পীর সাহেবের নিকট উপস্থিত হইল। তিনি তাহাকে নিকটে ডাকিয়া অত্যন্ত স্নেহের সুরে বলিলেন– তােমার জীবনের ঘটনা সভাস্থ সকলকে শুনাইয়া ইহাদের কৌতূহল
নিবারণকর।

হযরত বড় পীর সাহেবের আদেশ

হযরত বড় পীর সাহেবের আদেশে বাদ সভায় দাঁড়াইয়া বলিল— বাল্যকাল হইতেই সঙ্গীতের প্রতি আমার গভীর আকর্ষণ । বিভিন্ন স্থান হইতে গান ও বাজনা শিক্ষা করিয়া যৌবনকালে আমি একজন বিশেষ নামজাদা গায়ক ও বেহালা বাদকে পরিণত হইলাম।

নবাব-বাদশাহ, আমীর-ওমরাহ প্রমুখ বড় লােকদের মজলিসে গান গাইয়া ও বেহালা বাজাইয়া আমি উচ্চ প্রশংসা লাভ করিতাম। বড় লােকদের নিকট হইতে আমি যথেষ্ট টাকা–পয়সা পাইতাম এবং তাহা অকাতরে ব্যয় করিয়া দিবা- রাত্রি আমােদ-আহলাদে অতিবাহিত করিতাম। সাধারণ লােকে আমার গান-বাজনা।
শুনিবার সুযােগ পাইত না, কারণ বড় লােকদের সখের মজলিসেই আমার আদরের অন্ত ছিল না।

ক্রমে আমি যৌবন অতিক্রম করিয়া বার্ধক্যে উপনীত হইলাম, আমার গলার স্বর নষ্ট হইয়া গেল, বাজনা বাজাইতেও হাত কাঁপতে লাগিল, কাজেই বেহালায়ও আমি , আর সেইরূপ সুর দিতে পারিলাম না। আমার আদরও ক্রমেই কমিয়া আসিতে লাগিল। অবশেষে আমার অবস্থা এমন পর্যায়ে উপনীত হইল যে, কেহই আর আমাকে গান- বাজনা করিতে ডাকে না, টাকা পয়সাও দেয় না। যেীবনে যখন প্রচুর অর্থ হাতে আসিত, তখন কিছুই সঞ্চয় করি নাই। মনে করিয়াছিলাম যে, চিরদিনই এই ভাবেই আমার দিন কাটিয়া যাইবে, কিন্তু এখন আমাকে কেহ এক মুষ্টি ভিক্ষাও দেয় না, সেইজন্য পথে পথে ঘুরিয়া বেড়াই।

প্রতিজ্ঞা

একদিন একব্যক্তি আমাকে ঠাট্টা করিয়া বলিল,- জীবিত মানুষদের কেহ আল তােমার গান-বাজনা শুনিবে না—এখন কবরস্তানে যাইয়া মৃত লােকদিগকে শুনাও। কথাটা যে সে আমাকে ঠাট্টা করিয়া বলিল, তাহা আমি অবশ্যই বুঝিলা তথাপি আমি সেইদিন হইতে লােকালয় ত্যাগ করিয়া কবরস্তানে যাইয়াই, গান-বাজন
করিতে লাগিলাম। প্রতিজ্ঞা করিলাম জীবিত লােকদিগকে আর গান শুনাইব না।

সৎপথ অবলম্বন

কিছুদিন যাবত কবরস্তানেই গান-বাজনা করিয়া আসিতেছিলাম, কিন্তু গত রাত্রিতে আমি যখন বেহালা বাজাইয়া গান করিলাম, তখন কবর হইতে একজন মৃতলােক আমাকে বলিল—হে বেহালা বাদক। আর কতদিন মৃত লােকদিগকে গান শুনাইবে? এখন একটু চিন্তা ভাবনা কর। মৃত ব্যক্তির কবর হইতে এইরূপ উপদেশ শুনিয়া আমি তখনই অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া গিয়াছিলাম এবং কত সময় যে অজ্ঞান অবস্থায় ছিলাম, তাহা আমি বলিতে
পারিনা।

অতঃপর সেই বৃদ্ধ বেহালা বাদক, তাহার বেহালাটি ছুড়িয়া দূরে ফেলিয়া দিল এবং হযরত বড় পীর সাহেবের নিকট তওবা করিয়া সৎপথ অবলম্বন করিল।

ধন্যবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here